আজ ১৪ই মাঘ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২৮শে জানুয়ারি, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

কুড়িগ্রামে ফের বন্যার কষাঘাত; বিপাকে নদী অঞ্চলের মানুষ

জাহানুর রহমান খোকন: কুড়িগ্রামের টানা ৯ দিন বন্যার ধকল থেকে উঠতে না উঠতেই আবারো বন্যা শুরু হয়েছে।গত জুন মাসের ২৭ তারিখ থেকে কুড়িগ্রামে বন্যার পানি বিপদসীমার উপরে অবস্থান করে ৯ দিন স্থায়ী ছিল। তারপর মাঝে কয়েকদিন বিরতি দিয়ে আবারো শুরু হয়েছে ভারীবর্ষণ।ফলে কুড়িগ্রামের নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপদ সীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে কুড়িগ্রামের নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে ফলে কুড়িগ্রামে বর্তমানে মাঝারি বন্যা বিরাজ করছে। আজ রবিবার বিকেলে সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ধরলা নদী ব্রীজ পয়েন্টে বিপদসীমার ৬৬ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে করে কুড়িগ্রাম শহর সংলগ্ন ভেলাকোপা, পাঁচগাছি, শুলকুরবাজার, জগমোহনের চর, মেলেটারীরচর অঞ্চল বন্যার পানির নিচে তলিয়ে গেছে। অন্যদিকে দুধকুমার নদের নুনখাওয়া পয়েন্টে পানি বিপদসীমার ৩০ সেন্টিমিটার উপরদিয়ে, তিস্তা পয়েন্টে ২ সেন্টিমিটার উপরদিয়ে এবং ব্রহ্মপুত্র নদের চিলমারী পয়েন্টে ২৮ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

অপর দিকে ভারতের আসাম রাজ্যের ধুবরী জেলার মানকারচর থানাধীন কালো নদী দিয়ে পাহাড়ী ঢল সীমান্ত ঘেঁঁষা জিঞ্জিরাম নদীতে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে উপজেলার প্রায় শতাধীক গ্রামের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে এবং পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে ৫ শতাধীক হেক্টর জমির বিভিন্ন ফসল।

রবিবার নাগেশ্বরী উপজেলার রায়গঞ্জ ইউনিয়নের ফুলকুমার নদ এলাকায় বন্যার সাথে সাথে দেখা দিয়েছে নদী ভাঙ্গন। একদিকে বন্যা অন্যদিকে নদী ভাঙ্গনে দিশেহারা মানুষ আশ্রয় নিচ্ছে নিকটস্থ বেড়িবাঁধ এলাকায়। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বন্যার পানিতে ভেসে যাওয়া বেড়া ধরছেন ষাটোর্ধ আয়শা বেওয়া। তিনি জানান, নদী ভাঙ্গনে বসতবাড়ি হারিয়ে প্রতিবেশীর আঙ্গিনায় আশ্রয় নিয়েছি। এখন বন্যার পানি উঠে শ্রোতের টানে ঘরের মালামাল ও বেড়া ভেসে যাচ্ছে। আয়শা বেওয়া বলেন, ‘বাহে তোমার ওত্তি কি শুকান জাগা আছে।?। বানের পানি ভাসি যাই। একনা জাগা দেও।’ তার অদূরেই দেখা যায় কলার ভেলায় করে জ্বালানি কাঠ ও খড়ি নিয়ে যাচ্ছেন মাসুদ মিয়া। তিনি জানান, বন্যায় ঘরের মাচা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। জ্বালানি খড়ি সব ভেসে যাচ্ছে শ্রোতে। তাই কলার ভেলায় করে এগুলো শুকনো যায়গায় নিয়ে যাচ্ছি।

নাগেশ্বরী উপজেলার বীর দামালগ্রাম এলাকার কাকলী বেগমকে দেখা যায় ৭ বছরের প্রতিবন্ধী শিশু ইসমাইলকে কোলে নিয়ে পানিতে হেঁটে বেড়াতে। কাকলী বেগম জানান, ‘কয়দিন আগত বানের পানি আঙ্গিনায় ও ঘরে ৭ দিন ছিল, শুকপের দুইদিনও হয় নাই ফির বন্যা। ছাওয়া মানুষ কতক্ষেণ ঘরত থাকে, খালি বাইরে আসপের জন্য জেদ করে তাই কোলে করে বাইরে আনলং। প্রতিবন্ধী ছাওয়া হামার, একনাও শুকেন জাগা নাই যে ছাড়ি দেমো। খুব বিপদে আছি। এদিকে বন্যায় গরু ছাগল নিয়ে বসতবাড়ি ছেড়ে বাধের রাস্তায় আশ্রয় নিয়েছে প্রায় ১০ টি পরিবার। তারা জানায়, প্রায় ৫ শতাধিক পরিবার পানিবন্ধি অবস্থায় কষ্টে দিনাতিপাত করছে। তাদের অনেকের ঘরে খাবার নাই। কুড়িগ্রামের তিস্তা নদীতে পানি ২ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে, ফলে তিস্তা নদী অঞ্চলে তুলনামূলক বন্যার প্রকোপ কম দেখা গেলেও ভাঙ্গন অব্যাহত রয়েছে। উলিপুর থেতরাই ইউনিয়নের ৩ নং ওয়ার্ডের নদী ভাঙ্গনে কয়েকশত পরিবার বসতবাড়ি হারিয়েছে। হোকডাঙ্গা টি বাঁধ এলাকায় নদী ভাঙ্গন অব্যাহত রয়েছে। জুয়ানসতরার চরে বন্যায় মানুষ পানিবন্ধি হয়ে পরেছে। গবাদী পশুর খাদ্য নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছে ছোট ও মাঝারি খামারীরা।

কুড়িগ্রামের ব্রহ্মপুর নদবেষ্টিত রৌমারী উপজেলায় অতি বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে জিঞ্জিরাম নদীর পানি ও ব্রহ্মপুত্রের পানি বৃদ্ধি পেয়ে বন্যায় পানিবন্দি হয়ে পরেছে উপজেলাবাসী। গত বছরের ভয়াবহ বন্যায় বিভিন্ন এলাকার বেঁরীবাধ ও সংযোগকারী রাস্তাগুলো ভেঙ্গে গিয়েছিল। এক বছর অতিবাহিত হলেও বাঁধ ও সংযোগকারী রাস্তাগুলো মেরামত করা হয়নি। ফলে কয়েক দিনের টানা ভারীবর্ষনে ও উজান থেকে নেমে আসা ভারতীয় পাহাড়ী ঢলে ব্রহ্মপুত্র নদের ও জিঞ্জিরাম নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে নদের দু-কুল উপচে উপজেলা শহরের বিভিন্ন এলাকায় পানি ঢুকতে শুরু করেছে।

আগের বন্যার পানি কিছু শুকালেও হঠাৎ নতুন করে আবারো পানি বৃদ্ধি পেয়ে তলিয়ে গেছে বন্দবেড় ইউনিয়নের কুটিরচর, কান্দাপাড়া, টাঙ্গারীপাড়া, বাইশপাড়া,যাদুরচর ইউনিয়নের চাক্তাবাড়ি, চুলিয়ারচর, চান্দারচর, নওদপাড়া, ব্যাপারী পাড়া, খাটিয়ামারী, রতনপুর, শৌলমারী ইউনিয়নের বেহুলারচর, সুতিরপাড়, বোয়ালমারী, চরশৌলমারী ইউনিয়নের ঘুঘুমারী, খেদাইমারী, চরখেদাইমারী, দাঁতভাঙ্গা ইউনিয়নের ইটালুকান্দা ও ছাটকড়াইবাড়ীসহ উপজেলার প্রায় ১১৫ টি গ্রাম। এতে করে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে প্রায় ৮ শতাধিক পরিবার।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরিফুল ইসলাম জানান, অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় উজানের পানি প্রবাহের কারণে আগামী কয়েকদিন জেলার সবকটি নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে। ফলে জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে জেলার নদ-নদীর অববাহিকার অঞ্চলগুলোতে মধ্যম মানের বন্যা দেখা দিতে পারে যা ৭-১০ দিন স্থায়ী হতে পারে।
সম্ভাব্য বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলার প্রশাসনের তরফ থেকে যাবতীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

খাদ্য সহায়তা হিসেবে চাল ও শুকনো খাবারসহ শিশু খাদ্য সরবরাহের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলে কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক মো. রেজাউল করিম জানান।

শেয়ার করুন

কমেন্ট করুন

Comments are closed.

     এই ধরনের আরো সংবাদ